বিজ্ঞানীদের আজব পরীক্ষা, ৪০টি দেশে ইচ্ছা করে হারালেন টাকা ভর্তি ১৭০০০০ মানিব্যাগ, ফল অবিশ্বাস্য…

0
11166

অর্থ এমন একটা জিনিস যা মানুষকে খুব সহজেই অসৎ করে তুলতে পারে। অতিরিক্ত অর্থের হাতছানি মানুষের জীবনকে দুর্নীতিগ্রস্থ করে তোলে। আমদের পৃথিবী আর্থিক ভাবে দুর্নীতিতে জর্জরিত। সমগ্র পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। দুর্নীতির দায়ে সারা দেশের কত নেতা মন্ত্রী জেলে আছেন তার সংখ্যা দেখলে হতবাক হতে হয়।

বাকিদেশগুলোর তুলনায় ভারতের অবস্থা আরও সঙ্গিন। ঋণখেলাপি, তোলা, কাটমানি এই শব্দগুলো ভীষণ পরিচিত হয়ে গেছে আমাদের কাছে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে তাহলে কি ভুভারতে আর কোনো ভালো লোক নেই। একই প্রশ্ন জেগেছিল বিজ্ঞানীদের মনেও, তারা মানুষের আচরন নিয়ে গবেষণা করেন, এদের বলা হয় behavioral scientist। সাধারন মানুষের প্রশ্ন মনেই থেকে যায় কিন্ত এরা বিজ্ঞানী, উত্তর পেতে এরা মরিয়া, তাই উত্তর পেতে এরা পরিসঙ্খ্যান করবে বলে ঠিক করেন।

শুরু হলো আজব পরিক্ষা, তারা ঠিক করলেন টাকা ভর্তি ব্যাগ জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে দেবেন, আর সেগুলো নিজেরাই কুরিয়ে অন্য লোককে দেবেন। বলবেন এটা তারা কুরিয়ে পেয়েছেন কার ব্যাগ জানেন না। মানিব্যাগ গুলোতে থাকবে ডলারের আসল নোট, আর যিনি ছড়িয়ে দেবেন তার সঙ্গীর ফোন নাম্বার লেখা কাগজ।

এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছিলেন ফিনল্যান্ড শহরকে, ২ জন গবেষক সেখানে জান পর্যটকের ছদ্দবেশে। সেখানকার বিভিন্ন ব্যাঙ্ক-পোস্টঅফিসে গিয়ে কিছু লোকের হাতে মানিব্যাগ তুলে দিয়ে বলেন এটা তিনি কুড়িয়ে পেয়েছেন আর তিনি এই শহরে নতুন কাউকে চেনেন না তাই আপনি রাখুন যদি কেউ খোজ করেন তাহলে দিয়ে দেবেন প্লিজ। গবেষকরা ভেবেছিলেন মানিব্যাগে টাকা থাকলে সেটা কেউ ফেরত দেবে না, কারন ফ্রি লুজ ক্যাশ। কিন্ত গবেষকরা চমকে দেওয়া রেসাল্ট পেয়েছিলেন, যা ভেবেছিলেন তার উলটো ফল হয়েছিল।

গবেষক প্রধান আলেন কোহেন জানিয়েছেন মানুষ সেইসব মানিব্যাগ ফেরত দিয়েছেন যেগুলোতে বেশি অঙ্কের টাকা ছিল। প্রথমে আমরা বিশ্বাস করিনি, আমরা সহগবেষকদের বলেছিলাম টাকার অঙ্ক তিনগুন করে দিতে, কিন্ত আশ্চর্যজনকভাবে একই ফলাফল পাই।

পরীক্ষা ছড়ালো ৪০টি দেশের ৩৫৫টি শহরে। গবেষকরা ভাবেন ফিনল্যান্ডে বেশিরভাগ মানুষের চরিত্রে সততা জেকে বসে আছে, তাই তারা ঠিক করেন সারা দেশের অন্যান্য জায়গায় এই নিয়ে গবেষণা করবেন। সেইমত ৮০ জন গবেষক মিলে সারা মহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পর্যটকের বেশে ছড়িয়ে পরেন। তাদের উদ্দেশ্য ৪০টি দেশের ৩৫৫টি শহরে ১৭০০০টা মানিব্যাগ ছড়িয়ে দেওয়া।

কাজটা বেশ কঠিন, সারাদেশের অত্যাআধুনিক নজরদারি এড়িয়ে অতগুলো মানিব্যাগ ও ডলার নিয়ে প্রবেশ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এক একজন গবেষক ২০০ টির বেশি মানিব্যাগ ও ডলার নিয়ে পর্যটকের বেশে সমস্ত সিকিউরিটি সম্পূর্ণ করে দেশে প্রবেশ করেন। সন্দেহজনকভাবে কেনিয়ার বিমানবন্দরে এক পর্যটক আটকও হয়েছিলেন, কিন্ত পরে কূটনৈতিক ভাবে তাকে ছারিয়ে আনা হয়। যদিও ততক্ষণে ওই দেশে অন্য পর্যটক ঢুকে গেছে মিশন সফল করার জন্য।

গবেষকরা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে, সমুদ্রের তীরে, হোটেলে, ব্যাঙ্কে, স্টেশনে, কফিশফে, বারে ১৭০০০ মানিব্যাগ ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। গবেষণার স্বার্থে civic honesty এর উপর চালানো এই কাজ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নিয়ম, স্থানীয় কাউকে জানানো যাবে না, কারুর সাহায্যও নেওয়া যাবে না। কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবুও মানুষের স্বার্থে বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি।

কী হলো মানিব্যাগ গুলোর ঃ- ১৭০০০ মানিব্যাগের মধ্যে কিছু ব্যাগে টাকা ছিল না, কিছু ব্যাগে ১৩ ডলার আর কিছু ব্যাগে ১০০ ডলার ছিল, ৭২ শতাংশ ফেরত এসছিল ১০০ ডলারের ব্যাগ, ৬১ শতাংশ ফেরত এসছিল ১৩ ডলারের আর ৪৬ শতাংশ ফেরত এসছিল টাকা না থাকা ব্যাগগুলো। বিজ্ঞানী কোয়েন জানিয়েছে বেশিরভাগ মানুষই টাকা ফেরত দিয়েছেন যেটা আমাদের অবাক করিয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম টাকা আর ফেরত আসবে না।

কী পাওয়া গেলো পরীক্ষা থেকে ঃ- গবেষকরা খুশি তারা ভূল প্রমাণিত হয়েছেন বলে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্তর থেকে সৎ, পরের টাকা তারা অন্তর থেকে নিতে চান না। টাকা ফেরত দেওয়া মানুষের সাথে কথা বলে তারা ২ ভাগে ভাগ করেন।

প্রথম শ্রেণী – এরা সরল, নিঃস্বার্থ। এরা ভেবেছিলেন যারা ব্যাগ হারিয়েছেন তারা অনেক সমস্যায় পড়েছেন তাই তারা সহানুভূতিশীল হয়ে ব্যাগ ফেরত দিয়েছেন। দ্বিতীয় শ্রেণী – এরা নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চেয়েছেন, এরা ভেবেছেন টাকা ফেরত না দিলে নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, তাই এরা টাকা ফেরত দিয়েছেন।

যদিও বিজ্ঞানীরা বলেন এই ৪০টি দেশের ৩৫৫টি শহরের মধ্যে ভারত বা ভারতের কোনো দেশ ছিল কিনা, তবে এই পরীক্ষা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখিয়েছে মুল্যবোধের অবক্ষয় থাকা মানুষ গুলোকে। কারন “সুযোগের অভাবে চরিত্রবান” প্রবাদটিকে ফিকে করে দিয়েছে এই অসামান্য পরীক্ষাটি।