বাচিক শিল্পীর আয়নায়…

0
574

কবিতা আমরা ভালোবেসে পড়ি। কবির কথা, কবির মন জেগে থাকে আমাদের স্মৃতিতে, মনে। কিছু মানুষ এমন আছেন যারা শুধুমাত্র কবিতাকে ভালোবেসে, শব্দগুলোকে ভালোবেসে সেই উচ্চারণে কাটিয়ে দেন নিজের জীবন। কবিতার প্রতি ভালোবাসা আসলে একটা এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, জীবনের গল্প বলে- যে জীবন হয়তো দমে গেছে, দুঃখ পেয়েছে সময়ে অসময়ে- কিন্তু হারতে শেখেনি।

শাঁওলী মজুমদার এমনই একজন মানুষ। উত্তর কলকাতার একান্নবর্তী পরিবারের একটি বাচ্চা মেয়ের বাবা অফিস থেকে ৭টায় ফিরে বলতেন সন্ধ্যাবেলায় কোন ভালো মেয়ে পড়াশুনো করে না। সেই সময়ে তিনি মেয়েকে শেখাতেন কবিতা বলা। বর্ণময় উত্তর কলকাতায় তখন অনেক কবিতা প্রতিযোগীতা। YMCA , চালতাবাগান, গোয়াবাগান, চৈতন্য লাইব্রেরী- সব জায়গায় তখন কবিতার উচ্চারণ।

সুকুমার রায় এর সৎপাত্র কবিতার হাত ধরে ছোট্ট শাঁওলীর মঞ্চ জ্ঞান শুরু। মজার ঘটনা জড়িয়ে আছে এই প্রতিযোগীতার সঙ্গে। উদ্যোক্তারা ছবি তুলতে গেলে বাচ্চা মেয়েটি আগে pose দেয়। বিচারকরা যখন ভাবেন আহা বাচ্চা মেয়েটি ভুলে গেছে সাহায্য করি তখন মেয়েটি স্পষ্টভাবে বলে মনে আছে কবিতা, সে আগে ছবি তুলবে, তারপর শেষ করবে বাকি কবিতাটি।

এই স্পষ্ট কথা স্পষ্ট ভাবে বলার অভ্যেস এর পরেও একই রকম ছিল। ছোট্ট মেয়েটি যখন যেখানেই গেছে , প্রথম হয়েছে, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে। এই ভালোবাসাই হয়তো কবিতার প্রতি ভালোবাসাও বাড়িয়ে তুলেছে। অকপট স্বীকারোক্তি শাঁওলীর। যে জিনিস লোকের ভালোবাসা পেতে সাহায্য করছে তার প্রতি তো ভালোবাসা আসবেই।

এর পরের সময়ে বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যাদবপুর থেকে বাংলা এবং তুলনামূলক সাহিত্য পড়া মেয়েটির কাছে রয়ে গিয়েছিল কবিতাই। বাবা মারা গিয়েছিলেন ক্যান্সারে। মেয়ের মনে হয়েছিল জীবনের কবিতাদের হারিয়ে ফেলতে দেওয়া যাবেনা একেবারেই।সেখান থেকে হয়তো কবিতার যাত্রা শুরু নতুন ক’রে মেয়েটির হাত ধরে। শাঁওলী লক্ষ‍্য করেছিলেন কবিতা যারা পড়েন তারা বেশিরভাগই দুটো বড় অনুষ্ঠানের মাঝের যোগসূত্র। খুব অল্প সময় বরাদ্দ তাদের জন্য।

আর যারাই পড়েন তারা খালি গলায় পড়েন কবিতা এবং তারা একলা থাকেন। এগুলো বদলের দরকার ছিল। মানুষকে যদি বোঝানো যায় যে কবিতা আসলে একটা অভিজাত শিল্প তাহলে এই দুই অনুষ্ঠানের মাঝের ব্রাত্য জায়গাটা থেকে সরে দাঁড়িয়ে কবিতা নিজেই হয়ে উঠবে একটা অনুষ্ঠান। তার জন্য দরকার কমিউনিকেশন। কথা বলা।

কিভাবে মানুষের মন ছুঁয়ে ফেলা যায় সেটা বুঝিয়ে দিতে পারে একমাত্র সুর। বেদ বা উপনিষদ এর অংশ হোক অথবা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়া দুটোরই এক অদ্ভুত টেনে রাখার ক্ষমতা আছে। এই টেনে রাখার ক্ষমতা সব কিছুর থাকে না। তাই কবিতার মধ্যে আস্তে আস্তে শাঁওলী বুনে দিতে লাগলেন সুরের বুনন। এলো নানান melodious এবং rhythmic instrument এর ব্যবহার। কারণ কবিতা কখনোই এক সুরে নামতা পড়ে যাওয়ার মতো না। ভাব ও ভাষা অনুযায়ী বদলে যায় বলার ধরণ।

তাই কবিতা আর সুরের মাঝে অনায়াসে প্রবেশপত্র পেল ড্রামস, ঢোল এবং আরো বাদ্যযন্ত্র। ২০০৫ সাল থেকে সুরের সাথে এই কবিতার বুনন চলে আসছে। এই পথে চলার সময় সত্য , চিনু , দেবদীপ, শুভম- এদেরকে পাশে পেয়েছেন শাঁওলী । কারণ কবিগুরু একলা চলার কথা বলে গেলেও তিনি একলা চলায় বিশ্বাসী নন। সকলকে নিয়ে এগিয়ে চলাই তার লক্ষ্য।এই পথচলা , সবাইকে নিয়ে জন্ম দিয়েছে মহুল ব্যান্ডের। যারা শুধুমাত্র কাজ করেন বাংলা কবিতা নিয়ে।

তাদের কবিতার থাকে এক স্বরলিপি।কারণ সুর এখানে পিছনে থেকে যাওয়ার জিনিস নয়।একসাথে এগিয়ে নিয়ে চলে সে কবিতাকে। তাই স্বরলিপিতে শাঁওলীর কন্ঠ যেখানে থামে সেখান থেকে শুরু হয় সত্যর কি বোর্ডের জাদু, এগিয়ে চলে দেবদীপ এর গিটারে, চিনুর ড্রামসে, শেষ হয় শুভমের তবলায়। আবার কখনো তারা এগিয়ে চলে এক সুরে। মানুষ এই একসাথে সুরের মাধ্যমে কথা বলাটাকে ভালোবেসে গ্রহণ করেছেন।

মহুলের পথচলা এই ভালোবাসার হাত ধরে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে মানুষ তাদের অনুষ্ঠান শুনেছেন নানান সময়ে। স্বয়ং পি.সি. সরকার তাদের সিডির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেছেন। কারণ ওরা সহজ করে সুরের সাথে কবিতা বলেন। সহজ করে বুঝিয়ে দেন কবিতার বক্তব্য। শিল্পীর শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে গেলে তাদের কাছেও থাকতে হয় অর্থ। কারণ বিশাল বাণিজ্যিক এই পৃথিবীতে অর্থই একমাত্র স্বপ্নপূরণ করতে পারে। সেজন্য, নিজের কাজের এবং মহুল ব্যান্ডের কাজের যাতে কোনরকম কোন ব্যাঘাত না ঘটে, শাঁওলী খুলেছেন নিজের স্টুডিও।

২০১০ সাল থেকে সেই মহুল স্টুডিওর যাত্রা শুরু। বর্তমানে টালিগঞ্জে ৫ টা স্টুডিও। এই শহরে প্রথম দিকে শাঁওলী অনেক ঘুরেছেন। স্টুডিওতে ডেকে নিয়ে গিয়ে শুধুমাত্র কথা বলার জন্য তার থেকে নেওয়া হয়েছে পয়সা। তিনি ঠকেছেন, কিন্তু শিখেছেন তার চেয়ে বেশি। তাই তিনি চান না এই শহরে কোন শিল্পী আর প্রতারিত হন।

এছাড়াও তার তৈরি প্যাস্টেল এন্টারটেইনমেন্ট-এর মাধ‍্যমে তিনি শুধুমাত্র বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করতে চান এবং ছড়িয়ে দিতে চান সেই কাজগুলোকে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে এতদূর হেঁটে আসা পথে আরো অনেক এগিয়ে যেতে চান তিনি। Article সৌজন্যে – Bengal Web Solution (9903360341)